ভাষা আন্দোলন ও শেখ মুজিব

মযহারুল ইসলাম

shape

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক স্তরে উগ্র ইসলামপন্থীদের অনেকেই নানাবিধ কারণে বাংলা ভাষার সপক্ষে জোরালোভাবে কাজ করেছেন। এঁদের মধ্যে তমদ্দুন মজলিসের কর্মকর্তা ও কর্মীদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শেখ মুজিব এই মজলিসকে রাষ্ট্রভাষাসংক্রান্ত বহু কাজে সাহায্য ও সমর্থনদান করেন।

এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় ছাত্র এবং অধ্যাপকের উদ্যোগে নিজেদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখবার উদ্দেশ্যে ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকায় তমদ্দুন মজলিস নামে একটি সাংস্কৃতিক সংস্থা গঠিত হয়। এই মজলিস থেকে ১৯৪৭ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর তারিখে প্রকাশিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ‘বাংলা না উর্দু’ শীর্ষক একটি পুস্তিকায় কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ ও আবুল কাশেম বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের জন্য জোরালো ভাষায় বক্তব্য পেশ করেন এবং প্রয়োজনবোধে দেশব্যাপী আন্দোলন গড়ে তুলতে আহ্বান জানান। তমদ্দুন মজলিসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সংগ্রাম পরিষদ গঠনেরও এই আন্দোলনকে একটি সার্বিক ছাত্র ও গণ-আন্দোলনে উন্নীত করতে ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল। যদিও এই সংগঠন প্রতিষ্ঠার স্বল্পকালের মধ্যেই দুটো দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শাহ আজিজুর রহমান এই দলটিকে মুসলিম লীগের লেজুর হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন এবং এর মধ্যে সাম্প্রদায়িক চরিত্রকে প্রাধান্য দেবার চেষ্টায় ব্রতী হয়েছিলেন। সারা জীবন অসাম্প্রদায়িক নীতির উপাসক শেখ মুজিব এতে বাধা প্রদান করেন এবং পরিণামে এই দল দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শেখ মুজিব, আজিজ আহমদ, কাজী গোলাম মাহবুব প্রমুখ ব্যক্তির নেতৃত্বে ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ বলে একটি নতুন ছাত্র প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়। এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন মো. নঈমুদ্দিন। ভাষা আন্দোলনে এই দল একটি বৈপ্লবিক ভ‚মিকা পালন করে।

পরবর্তীকালে সুযোগ বুঝে শেখ মুজিবের নেতৃত্বেই এই ‘মুসলিম’ শব্দটি তুলে দিয়ে ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ’ নামে দলটির নামকরণ করা হয়। বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ আন্দোলনে ও স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমে এই ছাত্রদের ভ‚মিকা অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল। ১৯৪৮ সারের জানুয়ারি মাসে প্রতিক্রিয়াশীল পুঁজিবাদী ও সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট মুসলিম লীগের কর্তৃত্বকে খর্ব করার উদ্দেশ্যে বামপন্থী কর্মীরা ঢাকা শহরে একটি কর্মী সম্মেলন আহŸান করেন। ওয়ার্কার্স ক্যাম্প নামে এই সম্মেলন মুসলিম লীগের সাবেক অফিস ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে কয়েক দিন ধরে অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিব এই সম্মেলনে নেতৃত্ব দান করেন এবং বাংলাদেশের মানুষের সার্বিক স্বার্থে দেশের যুবশক্তি ও বামপন্থীদের সংঘবদ্ধ করতে কতকগুলো বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ওই বছর অর্থাৎ ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রæয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের ভাষা হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব করেন শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। তাঁর এই প্রস্তাবের সমর্থনে কয়েকজন সদস্যও বক্তৃতা দেন। কিন্তু এই প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং লিয়াকত আলী খান পর্যন্ত ন্যায়সঙ্গত প্রস্তাবের কঠোর বিরোধিতা করেন এবং বাংলা ভাষার গুরুত্ব বৃদ্ধিতে তিনি তাঁর ভাষণে হিন্দু প্রাধান্যের সূত্র সন্ধান করেন। ওই অধিবেশনে পূর্ব বাংলার খাদ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন উর্দুর সপক্ষে একটি উদ্ভট রায় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ অধিবাসীরই এই মনোভাব যে, একমাত্র উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণ করা যাইতে পারে।’ (নওবেলাল, ৪ঠা মার্চ, ১৯৪৮)

মুসলিম লীগ শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা নয়, এমনকি গণপরিষদের ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দানের দাবি পর্যন্ত অগ্রাহ্য হওয়ার সংবাদ ঢাকায় প্রকাশিত হওয়া মাত্র প্রগতিবাদী ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী মহল তীব্র অসন্তোষে ফেটে পড়তে থাকে। ২৬শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এক ধর্মঘট পালন করা হয়। ধর্মঘট চলাকালীন ঢাকার ছাত্রসমাজ বাংলা ভাষার সমর্থনে বিভিন্ন শ্লোগান দিতে দিতে শহর প্রদক্ষিণ করে। পরে বিকেলের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আবুল কাশেম। এখানে উল্লেখযোগ্য, এই মিছিলের সমগ্র ব্যবস্থাপনায় ও পরিচালনায় শেখ মুজিব বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দান করেন।

শেখ মুজিবসহ সকল প্রগতিবাদী ছাত্রনেতাই বাংলা ভাষার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একটি সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে অনুভব করেন। এই উদ্দেশ্যে এ দেশের বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীরা ২রা মার্চ ফজলুল হক মুসলিম হলে এক সভায় যাঁরা উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদ, মুহম্মদ তোয়াহা, আবুল কাশেম, রণেশ দাশ গুপ্ত, অজিত গুহ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। সভায় গণপরিষদ সিদ্ধান্ত ও মুসলিম লীগের বাংলা ভাষাবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সক্রিয় আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে একটি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এতে গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, তমদ্দুন মজলিস, ছাত্রাবাসগুলোর সংসদ প্রভৃতি ছাত্র ও যুব প্রতিষ্ঠান দুজন করে প্রতিনিধি দান করেন। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মনোনীত হন শামসুল আলম। এই সংগ্রাম পরিষদ গঠনে শেখ মুজিব বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন এবং তাঁর ভূমিকা ছিল যেমন বলিষ্ঠ তেমনি সুদূরপ্রসারী।

সংগ্রাম পরিষদ ১১ই মার্চ সাধারণ ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই দিন সারা পূর্ব বাংলায় এক প্রবল গণবিক্ষোভের উত্তাল তরঙ্গে সরকারের ভিত কেঁপে ওঠে। ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ ভাষা আন্দোলনের তথা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নব অধ্যায়ের সূচনা করে। ১১ই মার্চের ধর্মঘট পালনের কর্মসূচি সম্পর্কে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য আগের দিন অর্থাৎ ১০ই মার্চ ফজলুল হক হলে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ব্যাপকভাবে পিকেটিং করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নির্দিষ্ট দিনে ছাত্ররা পিকেটিং শুরু করে। তারা ঢাকা শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করতে থাকলে সরকারের নির্দেশে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। ধর্মঘটের জন্য পিকেটিংয়ের সময় যেসব ছাত্রনেতা বন্দী হন, শেখ মুজিব ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তাঁকে প্রথমে কোতোয়ালি থানায় ও পরে ঢাকা জেলে স্থানান্তর করা হয়।

১৫ই মার্চ পূর্ব বাংলার অ্যাসেম্বলির বৈঠক বসার কথা। ওই দিনই মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দিনের বাসভবন বর্তমান বাংলা একাডেমিতে মুসলিম লীগ পার্লমেন্টারি পার্টির বৈঠক চলাকালীন ধৃত ছাত্রদের মুক্তির দাবিতে একটি বিরাট মিছিল রাত্রি নয়টা পর্যন্ত বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এই বিক্ষোভের ফলে সরকার শেখ মুজিবসহ আরও কয়েকজন ছাত্রনেতাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

১৬ই মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সংগ্রাম পরিষদের সভা হয়। এই সভায় সভাপতিত্ব করেন শেখ মুজিব। তিনি সর্বসম্মতিক্রমেই সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। উক্ত সভায় পূর্বে অনুষ্ঠিত ফজলুল হক হলের বৈঠকে গৃহীত সংশোধনী প্রস্তাবসমূহ গৃহীত হয় এবং গৃহীত প্রস্তাবগুলো নাজিমুদ্দিনের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য অলি আহাদের হাতে দেওয়া হয়। অতঃপর বক্তৃতা পর্ব শেষ হলে একটি মিছিল অ্যাসেম্বলি ভবনের দিকে যাত্রা করে। উক্ত সভায় শেখ মুজিবের নাম যথারীতি প্রস্তাবিত ও সমর্থিত হয়েছিল এবং তিনি যথানিয়মে সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন। সভায় কোনো ধরনের হট্টগোল হয়নি। শেখ মুজিবের সংগ্রামী ও অকুতোভয় চারিত্র্যের একটি নিদর্শনও এ থেকে উপলব্ধি করা যায়। তিনি শুধু গরম বক্তৃতা দিয়ে বা সবাইকে মিছিলে উদ্বুদ্ধ করেই তাঁর দায়িত্ব শেষ করেননিÑ মিছিলের পুরোভাগে থেকে সমগ্র মিছিল তিনি পরিচালনা করেছিলেন।

১৫ই মার্চ জেল থেকে মুক্তি পেয়ে শেখ মুজিব ও শওকত আলী ফজলুল হক হল থেকে ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে গিয়ে সেখানেই রাত্রি যাপন করেন। পরদিন খুব সকালে তাঁরা আবার ফজলুল হক হলে ফেরত গিয়ে ছাত্রদেরকে একটি প্রতিবাদ সভার জন্য একত্র করার চেষ্টা করতে থাকেন। অতপর ১৬ই মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন শেখ মুজিব। সভাশেষে তিনি অ্যাসেম্বলির দিকে মিছিল পরিচালনা করেন।

১৬ই মার্চে যে মিছিলটি অ্যাসেম্বলি ভবনে গিয়ে অবস্থান করছিল, দুর্ভাগ্যক্রমে সন্ধ্যার দিকে এই মিছিলের ওপর লাঠিচার্জ করা হয় এবং এতে ১৯ জন ছাত্র গুরুতরভাবে আহত হয়। রাত্রে সংগ্রাম পরিষদের বৈঠক বসে ফজলুল হক হল মুসলিম হলে। ১৭ তারিখে এ দেশব্যাপী শিক্ষায়তনে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং ওই দিনের ধর্মঘট অভ‚তপূর্ব সাফল্য অর্জন করে। শেখ মুজিব একজন বলিষ্ঠ প্রত্যয়সম্পন্ন এবং অসম সাহসী যুবনেতা হিসেবে ছাত্রসমাজে এই সময় থেকেই ধীরে ধীরে স্বীকৃতি লাভ করতে থাকেন। শেখ মুজিব, তাজউদ্দিন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, নঈমুদ্দিন আহমদ, শওকত আলী, আবদুল মতিন, শামসুল হক প্রমুখ যুবনেতার কঠোর সাধনার ফলে বাংলা ভাষার আন্দোলন সমগ্র পূর্ব বাংলায় একটি গণ-আন্দোলন হিসেবে ছড়িয়ে পড়ল। জনসভা, মিছিল আর ¯েøাগানে সমগ্র বাংলাদেশ যেন কেঁপে উঠতে লাগল। রাস্তায়, দেয়ালে-দেয়ালে পোস্টারÑ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’। দাবি আদায়ের জন্য ভাষা সংগ্রাম কমিটি অক্লান্তভাবে কাজ করে যেতে লাগল। এই ভাষা সংগ্রাম কমিটির সঙ্গে ওতপ্রোত সম্পর্কে যাঁরা নিরলস কাজ করেছেন সেই সব ছাত্রনেতার মধ্যে শেখ মুজিব ছিলেন অন্যতম। শোভাযাত্রা ও বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেবার বেলায় অন্যান্যের মধ্যে শেখ মুজিবের ভ‚মিকা ছিল অবিস্মরণীয়।

১৯৪৮ সালে আইয়ুব খান পূর্ব বাংলার সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন। যা হোক ঠিক এই বিক্ষুব্ধ পরিবেশের মধ্যেই জিন্নাহ ঢাকায় এলেন। ১৯শে মার্চ বিকেলে তেজগাঁও বিমানবন্দরে তাকে সংবর্ধনা জানানো হয়। মনে রাখতে হবে, তিনি প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, পাকিস্তানের জাতির জনক ও গভর্নর জেনারেল। জিন্নাহর ধারণা ছিল যে তার মুখের ওপর কথা বলবে, এ রকম সাহস পাকিস্তানের কারও নেই। তাই প্রথমে তিনি ২১শে মার্চে অনুষ্ঠিত রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় দৃঢ়চিত্তে ঘোষণা করলেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’।

এবার শুধু মুজিব নয় এবং আবদুল মতিনও নয়, হলের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত শুধু ‘নো নো নো’ ধ্বনিতে জিন্নাহ সাহেবের কণ্ঠস্বর স্তিমিত হয়ে এসেছিল। ক্ষোভে, দুঃখে, অপমানে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তারপর আবার তিনি তাঁর ভাষণ শুরু করলেন। কিন্তু এবার তাঁর সুর অপেক্ষাকৃত নরম।

বিচ্ছিন্ন যুবশক্তিকে সংঘবদ্ধ করতে এবং ভাষা আন্দোলনকে একটি গণ-আন্দোলনে রূপান্তর করতে শেখ মুজিব যতই নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে শুরু করলেন, ততই দ্রæত তিনি সরকারের কোপানলে পতিত হতে লাগলেন। ১৯৪৮ সালের ১১ই সেপ্টেম্বরে অসাম্প্রদায়িক যুব নেতৃত্ব এবং ভাষা আন্দোলনের বলিষ্ঠ ভ‚মিকা, এই দুটো কারণেই তাঁকে সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগ সরকার পুনরায় কারারুদ্ধ করে। শেখ অ¤øানবদনে এই নিয়তিকে স্বীকার করেন।

১৯৪৯ সালে জেল থেকে মুক্তি পাবার পরপরই শেখ মুজিব রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে প্রতিবাদস্বরূপ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পরিচালনার জন্য তাজউদ্দিন আহমদ, তোয়াহা প্রমুখ নেতাকে নিয়ে ভাষা আন্দোলনকে আরও জোরদার করে তোলেন। ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের দাবিদাওয়া আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে শেখ মুজিবকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে পুনরায় পড়াশোনার সুযোগ দিতে রাজি ছিলেন, যদি তিনি ভবিষ্যতে ভালো হয়ে চলবার ‘বন্ড সই’ করে দিতেন। মুজিব এতে রাজি হননি। সে সময় তিনি বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিব আবার এই বিশ্ববিদ্যালয়েই আসবে তবে ছাত্র হিসেবে নয়, একজন দেশকর্মী হিসেবে।’ শেখ মুজিব তাঁর ওয়াদা পালন করেছিলেন। আড়াই বছর পর আবার তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনে ফিরে এসেছিলেন। তবে ছাত্র হিসেবে নয় একজন দেশকর্মী হিসেবেই। তিনি তখন আওয়ামী লীগের বিশিষ্ট নেতা।

মুসলিম লীগের বিরোধী দল মওলানা ভাসানীকে সভাপতি করে যে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেন শেখ মুজিব তার যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। তখন তিনি জেলে অবস্থান করছিলেন এবং তাঁর বিগত দুই বছরের বিপ্লবী নেতৃত্ব ও মহান ত্যাগের কথা বিবেচনা করে তাঁর অনুপস্থিতিতেই তাঁকে এই নবগঠিত দলের যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।

১৯৫২ সালের ২৬শে জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হয়ে ঢাকা সফরকালে নাজিমুদ্দিন পল্টন ময়দানে আবার দৃঢ়স্বরে ঘোষণা করলেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ ভুলে গেলেন তিনি তার চুক্তির কথা। বিশ্বাসঘাতকতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখালেন তিনি। খোন্দকার গোলাম মুস্তফা লিখেছেন: ‘১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ। আর ১৯৫২ সালের ২৬শে জানুয়ারী। মাঝখানে কয়েকটি বিশ্বাসঘাতক বৎসর আর খাজা নাজিমুদ্দিন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চের সংগ্রামের কথা স্মরণ করল। আর স্মরণ করল ১৫ই মার্চের চুক্তিপত্র লঙ্ঘন। চারটি বছর যেন বৃথা চলে গেছে। আর প্রতিবাদ, এমন দাবি, কোনো ফল নেই? প্রত্যয় দৃঢ়তর হয় ছাত্রসমাজের আবার আন্দোলন। অধিকার হরণকারীর বিরুদ্ধে মরণপণ প্রতিরোধ। এবার সমগ্র পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ ফেটে পড়ল। শুরু হলো মহাসংগ্রামের আয়োজন।

ভাষা আন্দোলনকে আরও জোরদার করে তুলবার জন্য ৩০শে জানুয়ারি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত সংগ্রাম কমিটিতে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, খিলাফতে রাব্বানী পার্টি, ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় সংগাম পরিষদ থেকে দুজন দুজন করে প্রতিনিধি নেওয়া হয়। কমিটির আহŸায়ক ছিলেন গোলাম মাহবুব। বলা বাহুল্য, এই সময়ে শেখ মুজিব জেলে ছিলেন। কিন্তু তিনি কৌশলে জেলে থেকে আন্দোলনকারী ছাত্রনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন। পরে জেলে বসেই আমরণ অনশন শুরু করেন।

Writer: মযহারুল ইসলাম

post_image

ভাষা আন্দোলন ও শেখ মুজিব

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক স্তরে উগ্র ইসলামপন্থীদের অনেকেই নানাবিধ কারণে বাংলা ভাষার সপক্ষে জোরালোভাবে কাজ করেছেন।

সম্পূর্ণ আর্টিকেল পড়ুন